আমার বন্ধু বরাত

FRIENDবরাত ছিল আমার প্রাইমারী স্কুলের বন্ধু। চতুর্থ শ্রেণীতে আমরা একসাথে পড়ি।তারপর আমি অন্য স্কুলে চলে যাই। আমার বাবা আমাকে একই স্কুলে কখনো দু’বছর পড়াননি।কারন ছোটবেলায় আমি এতই বাজে ছাত্র ছিলাম যে, কোনোবারই ফাইনাল পরীক্ষায় পাস করতে পারতাম না।টিচাররা বাবাকে ডেকে শুকনো গলায় বলতেন, ‘ভাইসাহেব আপনার ছেলেরতো মেধা বলতে কিছু নাই। মাথায় শুধু গোবর।ওকে আরেকবছর এই ক্লাসে রেখে দেন।যদি কিছু শিখতে পারে।’ বাবা চোখ গরম করে বলতেন, ‘দূর্‌ ! পড়াবোনা এই বাজে স্কুলে!কিচ্ছু শিখাতে পারেনা , শুধু আমার ছেলের দোষ।চলো বাবা তোমাকে অন্য স্কুলে ভর্তি করে দিই ।’ ফলশ্রুতিতে প্রত্যেকবছর নতুন নতুন স্কুলে নতুন নতুন বন্ধু হত আমার। আগের বন্ধুদের ভুলে যেতাম।কিন্তু বরাতকে ভুলতে পারিনি।আজ প্রায় পনের বছর পরও ওকে মনে পড়ছে।কারন ওর ছিলো অদ্ভুত কিছু বৈশিষ্ট্য।একটা উদাহরণ দিই।

রবিন নামে একটা ছেলে পড়তো আমাদের সাথে। বোকাসোকা টাইপের।তো একদিন রবিন ক্লাসে মন খারাপ করে বসে আছে।কেউ মনে হয় মেরেছে। সু্যোগ পেলে সবাই ওকে মারে।বরাত ওর কাছে গিয়ে বসল। বলল, ‘কিরে তর মন খারাপ?দাড়াঁ ভালো কইরা দিতাছি ।’ একথা বলেই বরাত ওর কলমের নিবটা বের করে ওটা দিয়ে কান খোঁচানো শুরু করল।ওর কানে আবার সবসময় ময়লা থাকত।

তাই সবাই ওকে “কানপঁচা বরাত” ডাকত। গন্ধে ওর পাশ দিয়ে হাঁটা যেতোনা। কিছুক্ষনের ভিতরে নিবের ডগায় ময়লা বেরিয়ে এলো।রবিন কিছু বোঝার আগেই বরাত ময়লাসহ নিবটা ওর মুখে ঢুকিয়ে দিলো।বরাত সবাইকে কানের ময়লা খাইয়ে মজা পেতো।ছেলেটা চিল্লায়ে উঠল। বমি করে দিতে চাইল। ভয়ে কেদেঁ ফেলল। তারপর হেডস্যারের কাছে গিয়ে বিচার দিলো।

হেডস্যার ওকে ডেকে বলল, ‘কিরে তুই না পরশু মার খেলি আমার হাতে।আবার কি করলি?হারামজাদা আজ তোর নিস্তার নাই।আজ তোকে রাম মাইর দিবো।রাম মাইর চিনো? হতচ্ছাড়া কোথাকার। মা-বাপ মরা নষ্ট পোলাপান।’ হেডস্যারের হাতের বেঁতের লাঠিটা চকচক করছে। আমরা সবাই দাঁড়িয়ে মজা দেখছি।হেডস্যার ওকে বেদম মেরে বেঁত ফাঁটিয়ে ফেললেন।একসময় টায়ার্ড হয়ে চলে গেলেন। এতো মার খাওয়ার পরও বরাত নির্বিকার। চোখে একটুও পানি নেই। স্যার যাওয়ার পর রবিনের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে ওকে ইচ্ছামতো মারল। তারপর প্যান্টের জিপার খুলে ওর গায়ে ঊষ্ণ জলের ধারা বইয়ে দিলো।এটা ছিলো ওর অন্যতম স্বভাব।কারো উপর মেজাজ খারাপ হলে তার গায়ে হিসুঁ করে দিতো।রবিন কাদঁতে কাদঁতে চলে গেলো।ভয়ে আর বিচার দিলোনা।

এসব কারনে ক্লাসের সবাই ওকে খুব ভয় পেত।ওর নামে কেউ তেমন একটা বিচারও দিতোনা।আমার সাথে ও কক্ষনো এমন করতোনা। কারন আমি ওকে গুরুমান্য করতাম।তাছাড়া অন্য একটা কারন থাকতে পারে। ওর যখন তিন বছর বয়স তখন ওর বাবা ওর মাকে তালাক দিয়ে চলে যায়। ওর মা মনের দুঃখে বিষ খেয়ে আত্নহত্যা করে। পরের বছর ওর বাবা একটা রাজনৈতিক দলের মিছিল করতে গিয়ে অন্য দলের গুলি খেয়ে মারা যায়।একা হয়ে যায় বরাত।মামা-মামীর কাছে চলে আসে ও। মামার অভাবের সংসারে এসে তাদের যন্রনা বাড়ায়। মামী সারাদিন বকে আর মারে। মামাতো ভাইবোনেরাও দেখতে পারেনা। ঠিকমতো দু’বেলা খেতে দেয়না। বাসায় হাড়িঁপাতিল মাজেঁ। জামা কাপড় ধোয় সবার। মামার চায়ের দোকানে বসে। বদলে স্কুলে পাঠায় মামা আর দু’ একবেলা খেতে দেয়। প্রায়ই না খেয়ে থাকে। আমি আমার বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান ছিলাম। তাই অনেক আদরে বেড়ে উঠছিলাম।প্রতিদিন মা টিফিন দিয়ে দিতো। আমি তা কখনো একা খেতাম না।বরাতকে নিয়ে খেতাম। তাই ও আমাকে অনেক পছন্দ করত। তাছাড়া আমাদের বাসায় নিয়েও অনেকদিন ভাত খাইয়েছি ওকে। ওই স্কুল ছেড়ে আসার পর ওর সাথে আর দেখা হয়নি দীর্ঘকয়েক বছর। ভুলতেই বসেছি প্রায়।

তখন নাইনে পড়ি।ঢাকা শহরের এই বয়েসী ছেলেমেয়েরা যত চালাক হয় আমি ততটা না।অনেক বোকা। রাস্তাঘাট কিচ্ছু চিনিনা। কারন আব্বু আমাকে বাসা থেকে একা বের হতে দেয়না। সারাদিন পড়তে বলে। একদিন আব্বু আম্মুর সাথে নিউমার্কেট যাই ঈদের জামা কাপড় কিনতে। আব্বুর হাত ধরে ভিড় ঠেলে হাটঁছি। কখন যে আব্বুর হাত ছেড়ে অন্য একটা লোকের হাত ধরেছি বলতেই পারবোনা। ভিড়ের মধ্যে আব্বু আম্মুকে হারিয়ে ফেলি।ভয়ে কেদেঁ দিলাম। এক সহানুভূতিশীল লোক আমার কাছে এসে বলে, ‘কি হয়েছে বাবা তুমি কাদঁছ কেন?’। আমি বললাম, ‘আমি বাবা মাকে হারিয়ে ফেলেছি।আমি বাসায় কিভাবে যাবো জানিনা।আমাদের বাসা শংকরে।’ লোকটি আমাকে শংকরের বাসে উঠিয়ে দিয়ে আসে । ১৩ নম্বর বাস। বাসে উঠার সময় হেলপার ছেলেটাকে পরিচিত পরিচিত বলে মনে হলো।ভালো করে তাকিয়ে দেখি বরাত।আমি বরাত বরাত করে চিল্লায়ে উঠি। বরাত অনেক্ষন তাকিয়ে দেখে আমাকে জড়িয়ে ধরে বলে-‘ওয়াসিম! দোস্ত তুই? কই যাস? এতো বছর পর দেহা।কেমন আছস?কই থাকস এহন।’ আমি ওকে সব খুলে বললাম।ততক্ষনে বাস ছেড়ে দিয়েছে।ও আমাকে পিছনে গিয়ে বসতে বলল।কন্ডাক্টরকে ডেকে বলল, ‘রিপন ভাই এইডা আমার বন্ধু।ভাড়া লইয়েন না।’ তারপর হাকডাঁক করে যাত্রী ডাকতে লাগল-“অই জিগাতলা …পনর লম্বর…সংকড়…মোহাম্মদপুর…অই আহেন আহেন সিট খালি… সিট খালি…”

ওইদিন আমাকে ওর বাসার ঠিকানা দিয়ে বলল, ‘দোস্‌ বাসায় আসিস । কেউ নাই। একা থাকি। তয় বিয়া করুম। একটা মাইয়ারে পছন্দ অইছে। ময়না নাম। আমগো বস্তিতে থাহে।’ আমি বাসায় যাবো কথা দিয়ে চলে এলাম কিন্তু আর যাওয়া হলনা।কয়েকদিন পর আবার ভুলে গেলাম।

বুয়েটে চান্স পাওয়ার পর বরাতের কথা মনে পড়ল।ভাবলাম ওকে একদিন দেখতে যাবো।ও শুনে খুশীই হবে যে, ছোটবেলার সেই ফেলটুস ওয়াসিম এখন বুয়েটে পড়ে।ওর বাবা মা থাকলে ওরও এতোদিনে ইউনিভার্সিটিতে পড়ার কথা।ওর দেয়া ঠিকানাটা ডায়েরীতে লিখে রেখেছিলাম। খুঁজে বের করলাম। রায়ের বাজার বস্তিতে থাকে ও। অনেক খুজেঁ বাসাটা পেলাম। ময়লা জলাশয়ের উপর বাশেঁর সারি সারি ঘর।পচাঁ দুর্গন্ধে নাক বন্ধ হওয়ার জোগাড়। নাক চেঁপে সবচেয়ে দক্ষিনের ঘরটার সামনে গিয়ে দাড়াঁলাম।দরজায় নক করলাম। ভাংগা দরজা। বেশি জোরে বাড়ি দিলে খুলেই যাবে। ভয়ে ভয়ে আরেকবার নক করলাম। ভিতরে বাচ্চার কান্নার আওয়াঁজ শোনা যাচ্ছে। মনে হয় বরাতের বাচ্চা। মনে মনে শালাকে একটা গালি দিলাম। শালা বিয়ে করে বাচ্চা নিয়ে ফেলছে আর আমার বাপ মায়ের কোনো আওয়াঁজই নাই।কি যে ভাগ্য!

দরজা খুলল শাড়ি পরা জীর্ণশীর্ন চেহারার একটি ১৬-১৭ বছরের মেয়ে। কোলে বাচ্চা।বাচ্চাকে দুধ খাওয়াচ্ছে।ছেড়া শাড়ির আচঁল দিয়ে নিজেকে ঢাকার সযত্ন চেষ্টা। আমি বললাম, ‘আমার নাম ওয়াসিম। আমি বরাতের কাছে এসেছি। ওর ছোটবেলার বন্ধু।’ মেয়েটা কিছুক্ষন অপলক চেয়ে থাকল। তারপর ভাইজানগো বলে বাচ্চাকে নিয়ে আমার পায়ের উপর পড়ল। আমি হকচকিত হয়ে গেলাম। মেয়েটার করুন আর্তনাদ বস্তির মানুষরা গা করছেনা। তারা কেউ ফিরেও তাকাচ্ছেনা। তারা মনে হয় এরকম আচরনে অভ্যস্ত। আমি বাচ্চাটাকে কোলে তুলে নিয়ে বললাম, ‘কী হয়েছে আমায় খুলে বলুন।কাদঁবেন না।’ মেয়েটা আরো জোরে চিল্লায়ে উঠল। ‘ভাইজানগো আপনের বন্ধুতো আর নাইগো…আপনের কতা আমারে কত্ত কইতগো ভাইজান…পাচঁ মাস আগে হ্যায়ঁ গাড়িত কইরা বরিশাল যাইতাছিল।ট্যারাকের লগে ধাক্কা খাইয়া হ্যাঁর মগজ থেতলাইয়া গেছেগো ভাইজান।ও ভাইজান আমি শেষ হইয়া গেছি…আমার বাচ্চাডারে লইয়া কি করুম গো ভাইজান…’।

আমি নিথর দাঁড়িয়ে রইলাম। একজন অসহায় নারীর কাঁন্না শুনা ছাড়া আমার যে আর কিছুই করার নেই।

5 Comments

Add a Comment
  1. প্যাথেটিক। চোখে পানি চলে আসার মত।

  2. ঘটনাটা আসলেই খুব কষ্টদায়ক 🙁

  3. বেশ দুঃখজনক স্মৃতিকথা।

  4. জি নেজাম ভাই, এই ঘটনা মনে পড়লে মনটা খারাপ হয়ে যায়।
    বাই দ্য ওয়ে, ধন্যবাদ আমার ব্লগ পড়ার জন্য 🙂

  5. Very pathetic. Road accidents kill so many life; specially in Bangladesh. Please be careful & try not to use mobile phones at road unless it’s very important. Thanks. Mahamud.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *